নেপালের ত্রিশূলী নদীর তীরে কাদায় ভরা বিশাল টানেলের ভেতরে শত শত কর্মী আটকা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের পরিবারের সদস্যরা এখনও আশায় রয়েছেন, প্রিয়জনদের জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
বিবিসি নেপালি সূত্রে জানা গেছে, ভোটেকোশী-ত্রিশুলি নদীর আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ৯০০ জনেরও বেশি কর্মী যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছেন বলে কর্মকর্তারা সন্দেহ করছেন। তবে টানেলের ভেতর আটকে পড়াদের সঠিক সংখ্যা এখনো জানা যায়নি।
নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজরাম বসনেত বিবিসি নেপালিকে জানিয়েছেন, সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত রাসুওয়াগাধি, লাংটাং, চিলিমে, আপার ত্রিশুলি ৩এ এবং আপার ত্রিশুলি ৩বি এলাকায় উদ্ধার অভিযান চলছিল।
ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্প এলাকায় পাহাড়ের ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পথ তৈরি করা হচ্ছে এবং সুড়ঙ্গের ভেতরে বাতাস পাঠানো হচ্ছে। উদ্ধারকারীদের আশঙ্কা, জীবিতদের কাছে পৌঁছানোর গুরুত্বপূর্ণ সময় দ্রুতই ফুরিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে বন্যা বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯৩৯-এ দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।
সংস্থাটি নিখোঁজ মানুষের সংখ্যার হিসাবও সংশোধন করে ৩ হাজার ৯২৫ করেছে। তাদের মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সোমবার জানিয়েছেন, প্রকল্প এলাকাগুলো থেকে এখন পর্যন্ত ২৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
চীনা ও নেপালি সামরিক সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক দল উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে। ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞরাও এতে সহায়তা করছেন।
সোমবার সকালে একটি দল একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে যাওয়া একটি টানেলে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু সেখানে কাউকে না পেয়ে তারা ফিরে আসে।
আটকে থাকা এক ব্যক্তির স্বজন জীবন খড়কা কান্তিপুর-কে বলেন, যত বেশি সময় যাচ্ছে, আমাদের আশা ততই কমে যাচ্ছে। এই অভিযান আরও দ্রুত করতে হবে, কারণ আমাদের কাছে প্রতিটি সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ।
খড়কা আরও বলেন, উদ্ধার অভিযানে ধীরগতির বিষয়টি হতাশাজনক।
অস্ট্রেলিয়ান প্রকৌশলী আর্নল্ড ডিক্স দূর থেকে নেপালি কর্তৃপক্ষকে ভূগর্ভস্থ অনুসন্ধান অভিযানে সহায়তা করছেন। তিনি বলেছেন, উদ্ধারকারীরা টানেলগুলোর অবস্থান শনাক্ত করতে সমস্যায় পড়ছেন।
ডিক্স বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অবস্থান শনাক্ত করা গেলে সেগুলোতে পৌঁছানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। সাধারণত এর জন্য খনন এবং ‘বড় বড় পাথরে বিস্ফোরণ ঘটাতে’ হয়।
তিনি বলেন, এখানে এমন পাথর রয়েছে যেগুলো বাড়ির চেয়েও বড়- আমি জীবনে আগে কখনও এমন কিছু দেখিনি। এটি সত্যিই এক অসাধারণ অভিযান।
তবুও ভূগর্ভে আটকে থাকা মানুষদের নিয়ে তিনি কিছুটা আশাবাদী। কারণ ওপরের প্রবল বন্যার ধাক্কা থেকে ভূগর্ভস্থ পরিবেশ তাদের কিছুটা সুরক্ষা দিয়ে থাকতে পারে।
এদিকে বন্যার মূল আঘাতের স্থান থেকে অনেক দূরে, ভাটির দিকে অবস্থিত চিতওয়ান জেলায় অস্থায়ীভাবে মৃতদেহ দাফন করা হচ্ছে।
হিমালয় অঞ্চলের নদীগুলো দিয়ে প্রায় তিনশ মৃতদেহ ভেসে এসে ওই এলাকার তীরে জমা হয়েছে।
পচনের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। সাদা ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ও মাস্কও পরা কর্মীরা শনাক্ত করা যায়নি এমন মৃতদেহগুলো ট্রাকে তুলে দিচ্ছিলেন।
জেলা প্রধান কর্মকর্তা গণেশ আরিয়াল বিবিসি নেপালিকে বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মৃতদেহ শনাক্ত হওয়ার পর স্বজনরা তাদের প্রিয়জনের মরদেহ ফেরত নিতে পারবেন।
তিনি বলেন, আমাদের কাছে পর্যাপ্ত ফ্রিজার নেই, তাই অস্থায়ীভাবে দাফন করাই ছিল শেষ বিকল্প। আমরা পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে সত্যিই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছি।
তিব্বতে এখন পর্যন্ত সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১৬ এবং নিখোঁজের সংখ্যা ৫৪৬ বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।

