যুক্তরাষ্ট্র প্রচলিত সামরিক উপায়ে ইরানের নেতৃত্বকে উৎখাতে ব্যর্থ হলে দেশটির বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কাউন্টারটেররিজম উপদেষ্টা জো কেন্ট এই বড় আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।
শুক্রবার কার্লসনের অনুষ্ঠানে কথা বলার সময় কেন্ট বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তার ভাষায়, এমনটা ঘটবে না ধরে নেওয়া হবে “বোকামি”, বিশেষ করে যখন ট্রাম্প প্রশাসন এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে।
গত এপ্রিল মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, তেহরান যদি ওয়াশিংটনের দাবি মেনে না নেয়, তাহলে ইরানের “পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে”। এরপরও ট্রাম্প একাধিকবার একই ধরনের হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রয়োজনে মার্কিন বাহিনী ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করে দিতে পারে।
জো কেন্টের দাবি, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ও অর্থনৈতিক—দুই ধরনেরই ব্যাপক চাপ প্রয়োগ করেছে।
কেন্টের মতে, ওয়াশিংটন যদি এখনও ইরানের নেতৃত্বকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়ে দেশটিকে “সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণে” বাধ্য করতে চায়, তাহলে ট্রাম্পের সামনে মূলত দুটি পথ রয়েছে—ইরানে বড় ধরনের স্থল অভিযান চালানো অথবা পারমাণবিক হামলা করা।
তবে ইরানের বিশাল ভূখণ্ড ও বিপুল জনসংখ্যার কারণে স্থল অভিযান বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করেন কেন্ট।
তিনি বলেন, পরিস্থিতিকে দীর্ঘ সময় ধরে বিবেচনা করলে “খুব দ্রুতই গণবিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের” সম্ভাবনার কথা সামনে চলে আসে।
কেন্ট অবশ্য এটিকে একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ইরানের পাহাড়ি এলাকায় ভূগর্ভে থাকা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে সীমিত পরিসরে পারমাণবিক হামলার কথা বিবেচনা করতে পারে।
গত মাসের শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ দফার হামলা হঠাৎ স্থগিত করা হয়। এর পর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের (পেন্টাগন) উচ্চ-নির্ভুলতার ক্ষেপণাস্ত্র ও শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের মজুত অনেকটাই কমে গেছে।
তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং আরও কয়েকজন শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা অস্ত্রের ঘাটতির খবর জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র ও গোলাবারুদ পেন্টাগনের হাতে রয়েছে।
এর মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলে পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গত সপ্তাহে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইরানের বিরুদ্ধে একটি “কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান” শুরু করা হয়েছে। তিনি এর নাম দেন “ইকোনমিক ডি-ডে”।
এর কয়েক দিন পর মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে নতুন একগুচ্ছ নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেন। এসব নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছে বিভিন্ন দেশের প্রায় ৬০টি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও জাহাজ। এর মধ্যে চীনে অবস্থিত ২১টি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি রয়েছে।
বেসেন্ট বলেন, ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে অনিচ্ছুক দেশগুলোকেও চাপের মুখে ফেলাই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য। এর মাধ্যমে ইরানকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে একটি “বহিষ্কৃত রাষ্ট্রে” পরিণত করতে চায় ওয়াশিংটন।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি ইরানের হয়ে অর্থ পাচারে সহায়তা করে, তাহলে তাকে মার্কিন ডলারের আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বাদ দেওয়া হবে।
অর্থাৎ, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার কথা বলছে, অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াচ্ছে। এর মধ্যেই সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা জো কেন্টের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কার মন্তব্য নতুন করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

