ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক ক্ষমতায় নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি হয়েছে। ন্যাটো যেমন ইউক্রেনের পাশে আছে, তেমনি উত্তর কোরিয়া পাশে দাঁড়িয়েছে রাশিয়ার।
উত্তর কোরিয়ার সৈন্যরা সরাসরি রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে। এর আগে ২০২৩ সাল থেকেই উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ, কামানের গোলা এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল সরবরাহ করে আসছিল।
২০২৪ সালে রাশিয়া এবং উত্তর কোরিয়া ন্যাটো স্টাইলে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুযায়ী কোনো দেশের ওপর হামলা হলে অন্য দেশ সেটিকে নিজের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করবে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের এই মেলবন্ধন বদলে দিয়েছে বৈশ্বিক সামরিক সক্ষমতার সব হিসাব-নিকাশ।
ইউক্রেনীয় ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্সের ডেপুটি হেড মেজর জেনারেল ভাদিম স্কিবিটস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়ায় ইতিমধ্যে মোতায়েন থাকা সাড়ে ৮ হাজার উত্তর কোরীয় সেনার নতুন দলটিতে একটি ড্রোন ইউনিট রয়েছে, যা ইউক্রেনের অভ্যন্তরে লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ করতে পারে।
স্কিবিটস্কি আরও বলেন, ইতিমধ্যে মোতায়েন করা উত্তর কোরীয় সেনারা প্রধানত রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে এবং তাদের মধ্যে এক হাজার প্রকৌশলী ও মাইন নিষ্ক্রিয়কারী রয়েছেন। এর মধ্যে ৪শ জন ড্রোন অপারেটরও রয়েছেন, যাদের অনেকেরই পূর্ববর্তী উত্তর কোরীয় মোতায়েন থেকে অভিজ্ঞতা রয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার এই গভীর সম্পর্ক ন্যাটো জোটের অনেকের মধ্যেই উদ্বেগ তৈরি করছে। রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার আরো ঘনিষ্ঠতার সময়েই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বছরই উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কিম জং উনকে অসন্তুষ্ট না করতে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়া কমিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে।
ইউক্রেনীয় অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ২০২৪ সালের অক্টোবরে কুরস্ক অঞ্চলে প্রথম উত্তর কোরীয় সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল, যা ছিল নাৎসিদের পর রাশিয়ার মাটিতে প্রথম কোনো অনুপ্রবেশ। রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে সহায়তা করার জন্য তাদের এই প্রাথমিক সেনা মোতায়েনের বিষয়ে উত্তর কোরিয়া কয়েক মাস নীরব ছিল এবং অবশেষে ২০২৫ সালের এপ্রিলে তারা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে নিজেদের সৈন্যদের লড়াইয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে।
দুই দেশের সম্পর্কের দৃঢ়তা তুলে ধরে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম গত এক বছর ধরে রাশিয়ার অভ্যন্তরে উত্তর কোরিয়ার সৈন্যদের প্রশিক্ষণের ছবি দেখিয়েছে এবং কিম জং উন এপ্রিলে ইউক্রেনে নিহত উত্তর কোরীয় সৈন্যদের স্মরণে একটি স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করেন।
রাশিয়ার পাশে দাঁড়ানোর পেছনে উত্তর কোরিয়ারও স্বার্থ আছে। অস্ত্রের বিনিময়ে উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার কাছ থেকে আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি পাচ্ছে। রাশিয়া উত্তর কোরিয়ার সামরিক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে প্রযুক্তিগত সাহায্য করেছে এবং পিয়ংইয়ংকে উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে সহায়তা করছে। তীব্র আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা উত্তর কোরিয়াকে রাশিয়া জ্বালানি তেল, খনিজ এবং তাদের দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য ঘাটতি মেটাতে কৃষি খাতে বড় ধরনের সহায়তা দিচ্ছে।
রাশিয়ার পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে উত্তর কোরিয়ার সেনারা একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জন করছে। পাশাপাশি বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র পরীক্ষা করে দেখছে। পারস্পরিক সহযোগিতার ফলে উত্তর কোরিয়ার সামনে ক্ষেপণাস্ত্র, নৌ ও আকাশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে রাশিয়ার থেকে দক্ষতা অর্জনের সুযোগও বাড়তে পারে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ সম্প্রতি উল্লেখ করেছেন যে, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া যৌথভাবে পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি ’নতুন ও ন্যায়সংগত বিশ্বব্যবস্থা’ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছে।

